মাযহাব মানা কি ফরজ কোরআন হাদিস থেকে বিস্তারিত আলোচনা

By | February 20, 2023
মাযহাব মানা কি ফরজ

এই পোষ্টের মাধ্যমে মাযহাব মানা কি ফরজ কোরআন হাদিস থেকে বিস্তারিত আলোচনা সকল জানতে পারবেন। আশা করি মাজহাব নিয়ে যত প্রশ্ন আছে উত্তর পেয়ে যাবেন।

মাযহাব মানা কি ফরজ, মাযহাব নিয়ে বিস্তারিত সকল আলোচনা

মাযহাব ইসলামকে ভাগ করেনি বরংমাযহাব ইসলামকে অনেকগুলো ভাগে ভাগ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। ফলে কেমন যেন আল্লাহতালার এটা একটা বিশেষ রহস্য বা কুদরত যে, তিনি চারটা মাজহাবের মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলের পক্ষ থেকে প্রমাণিত যত ধরনের আমল হতে পারে এটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সারা বিশ্বে আমল করা হচ্ছে। 

সম্মানিত দ্বীনি ভাই এবং বোনেরা আজকে আমরা মাযহাব নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের এই আলোচনাটিতে আমরা মাযহাব নিয়ে পয়েন্ট আকারে কথা বলব, ইনশাআল্লাহ।

  • * মাযহাব কি ও কেন?
  • * কারা মাযহাব তৈরি করেছেন?
  • * মাযহাব কেন হয়েছে?
  • * মাযহাব মানা প্রয়োজন কেন?
  • * রাসূল সাঃ এর  মাযহাব কি?
  • * সাহাবীদের মাযহাব কি?
  • * তাবেয়ীদের মাযহাব কি?
  • * মুহাদ্দিসগন কি মাযহাব মেনেছেন?
  • * কেন একটি মাযহাবই মানতে হবে?
  • * মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি?
  • * কুরআন ও হাদীস দেখে আমল করলে অসুবিধা কোথায়?
  • * চারটি বিখ্যাত মাযহাব কি করে প্রতিষ্ঠিত হলো?
  • (হানাফী মাযহাব, মালিকি মাযহাব, শাফি মাযহাব, হাম্বলী মাযহাব)
  • * মাযহাবের চার ইমামের মাঝে সম্পর্ক কেমন ছিল?
  • * একসাথে চারটি মাযহাব মানা যাবে কি?
  • * মাযহাব নিয়ে আমাদের সমাজে এখন বাড়াবাড়ি চলছে কেন?

মাযহাব কি কেন?

শুরুতে আমরা জানবার চেষ্টা করব যে মাযহাব কি? আমরা জানি যে মাজহাব এটা হচ্ছে আরবি শব্দ এই মাযহাব শব্দের অর্থ হচ্ছে পথ বা মত কিংবা অভিমত। অর্থাৎ ইমামদের গবেষণালব্ধ যে মতামত অভিমত এটাকে আরবীতে মাযহাব বলা হয়। যে পথের গন্তব্য কোরআন এবং সুন্নাহ সেটা হচ্ছে মাযহাব।

কারা মাযহাব তৈরি করেছেন?

মাযহাব করা তৈরি করেছেন জানার আগে জেনে নিন মুজতাহিদ কাদেরকে বলে। মুজতাহিদ হল কুরআন সুন্নাহ, সাহাবাদের ফাতওয়া, কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ঐক্যমত্বে এবং যুক্তির নিরিখে কুরআন সুন্নাহ থেকে মাসআলা বের করাকারী গবেষক দলের নাম। যারা নিষ্ঠার সাথে বিভিন্ন মূলনীতি নির্ধারণ করে কুরআন সুন্নাহর বাহ্যিক বিপরীতমুখী মাসআলার মাঝে সামাঞ্জস্যতা এনেছেন। কুরআন সুন্নাহর একাধিক অর্থবোধক শব্দের নির্ধারিত পালনীয় অর্থকে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। নতুন উদ্ভূত মাসআলার শরয়ী মূলনীতির আলোকে সমাধান বের করেছেন। সেই সাথে নতুন নতুন মাসআলার কোন মূলনীতির আলোকে হুকুম আরোপিত হবে যার বিধান সরাসরি কুরআন সুন্নাহে বর্ণিত নেই, সেই মূলনীতিও নির্ধারিত করেছেন। মূলত সেই গবেষক দলের নাম হল মুজতাহিদ। আর তাদের উদ্ভাবিত মূলনীতির আলোকে বের হওয়া মাসআলার নাম মাযহাব।

অনেক সময় এমন হয় যে কোরআন এবং সুন্নাতে যে বিধি-বিধানগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো সরাসরি হয়তো আমাদের বুঝে আসেনা কিংবা মানাটাও আমাদের জন্য কষ্ট হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে এটাকে বুঝবার জন্য এটাকে সহজভাবে আমল করবার জন্য আমাদেরকে মাজহাবের মতামতে আমল করতে হয়। সেটা আমাদের জন্য আমল করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। তাহলে আমরা বলতে পারি যে মাযহাব কোরআন সুন্নাহর বিরোধী কিছু নয় বরং কোরআন এবং সুন্নায় যে বিধানগুলো রয়েছে এগুলোকে একটা সুবিন্যস্ত ধারাতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই মাজহাবে কোরআন ও হাদিসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হচ্ছে মাযহাবের ইমামদের সংকলি ফিকাহ ইসলামি এবং এই ফিকাহ শাস্ত্র গুলোকে সাধারণত মাযহাব বলা হচ্ছে। প্রসিদ্ধ মাযহাব আমরা জানি যে চারটি হানাফি শাফি মালিকি এবং হাম্বলী।

মাযহাব কেন হয়েছে?

আমরা জানি যে কোরআন সুন্নাতে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়েছে এবং মাযহাবে সেটাকে সুশৃংখল ভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেমন ধরুন- নামাজে ফরজ কয়টি বা নামাজের ওয়াজিব কয়টি এ ব্যাপারে কিন্তু পুরো কুরআন বা হাদিস ঘেঁটে আপনি বের করতে পারবেন না যে এতটি মোট সালাতের ফরজ, এতটি হচ্ছে সালাতের ওয়াজিব, এইভাবে কোরআন সুন্নায় কোথাও উল্লেখ করা নেই। মাযহাবের ইমামগণ নিরলস প্রচেষ্টা করে অনেক গবেষণা করে সাধারনত এ প্রশ্নের উত্তর গুলো খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এবং তারা হাজার হাজার মাসআলা বাদ করেছেন যেটা আমাদের ইসলামী বিধি-বিধানকে বুঝা এবং সহজ ভাবে মানা এটা আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছে।

তাহলে আমরা এক কথায় বলতে পারি কোরআন সুন্নাহর সহজ এবং সার নির্দেশই হচ্ছে মাযহাব।

মাযহাব মানা প্রয়োজন কেন?

মাযহাব পালনের কথা এই জন্য বলা হয় যে, যেহেতু কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে আলেম খুবই নগণ্য। যারাও আছে তারা কুরআনে কারীমের কোন আয়াতের হুকুম রহিত হয়ে গেছে, কোন আয়াতের হুকুম বহাল আছে, কোন আয়াত কোন প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে, কোন আয়াত কাদের উদ্দেশ্য করে নাজিল হয়েছে। কোন আয়াতাংশের প্রকৃত অর্থ কি? আরবী ব্যাকরণের কোন নীতিতে পড়েছে এই বাক্যটি? এই আয়াত বা হাদীসে কী কী অলংকারশাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে? ইত্যাদী সম্পর্কে বিজ্ঞ হন না। সেই সাথে কোনটি সহীহ হাদীস কোনটি দুর্বল হাদীস? কোন হাদীস কি কারণে দুর্বল? কোন হাদীস কী কারণে শক্তিশালী? হাদীসের বর্ণনাকারীদের জীবনী একদম নখদর্পনে থাকা আলেম এখন নাই। অথচ হাদীস শক্তিশালী না হলে তার দ্বারা শরিয়া হুকুম প্রমাণিত হয়না।

এই সকল বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পাওয়া যাওয়া দুস্কর। একেতু অধিকাংশ মানুষই আলেম না। আর মুষ্টিমেয় যারা আলেম তারাও উল্লেখিত সকল বিষয় সম্পর্কে প্রাজ্ঞ নয়। তাই আমাদের পক্ষে কুরআন সুন্নাহ থেকে সঠিক মাসআলা বের করা অসম্ভব।

একটি উদাহরণ-

এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- তথা সালাত কায়েম কর। আরেক আয়াতে বলেছেন-

তথা নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা এবং ফেরেস্তারা নবীজীর উপর সালাত পড়ে। এই আয়াতের শেষাংশে এসেছে-

তথা হে মুমিনরা তোমরাও তাঁর উপর সালাত পড় এবং তাঁকে সালাম জানাও। {সূরা আহযাব-৫৬}

এই সকল স্থানে লক্ষ্য করুন-“সালাত” শব্দটির দিকে। তিনটি স্থানে সালাত এসেছে। এই তিন স্থানের সালাত শব্দের ৪টি অর্থ। প্রথম অংশে সালাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল “নামায” অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা নামায কায়েম কর। {সূরা বাকারা-৪৩}

আর দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ও তার ফেরেস্তারা নবীজী সাঃ এর উপর সালাত পড়েন মানে হল-আল্লাহ তায়ালা নবীজী সাঃ এর উপর রহমত পাঠান, আর ফেরেস্তারা নবীজী সাঃ এর জন্য মাগফিরাতের দুআ করেন।

আর তৃতীয় আয়াতাংশে “সালাত” দ্বারা উদ্দেশ্য হল উম্মতরা যেন নবীজী সাঃ এর উপর দরূদ পাঠ করেন।

একজন সাধারণ পাঠক বা সাধারণ আলেম এই পার্থক্যের কথা কিভাবে জানবে? সেতো নামাযের স্থানে বলবে রহমাতের কথা, রহমতের স্থানে বলবে দরূদের কথা, দরূদের স্থানে বলবে নামাযের কথা। এরকম করলে দ্বীন আর দ্বীন থাকবে না, হবে জগাখিচুরী।

এরকম অসখ্যা স্থান আছে, যার অর্থ উদ্ধার করা কঠিন। তাই একজন বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ব্যক্তির শরাপন্ন হয়ে তার গবেষনা অনুযায়ী উক্ত বিষয়ের সমাধান নেয়াটাই হল যৌক্তিক। এই নির্দেশনাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন-

তথা তোমরা না জানলে বিজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও। {সূরা নাহল-৪৩}

বিজ্ঞ ফুক্বাহায়ে কিরাম কুরআন সুন্নাহ, ইজমায়ে উম্মাত, এবং যুক্তির নিরিখে সকল সমস্যার সমাধান বের করেছেন। সেই সকল বিজ্ঞদের অনুসরণ করার নামই হল মাযহাব অনুসরণ। যেই অনুসরণের নির্দেশ সরাসরি আল্লাহ তায়ালা দিলেন পবিত্র কুরআনে।

রাসূল সাঃ এর  মাযহাব কি?

মাযহাব কি এটা নিশ্চয় উপরে বর্ণিত কথা থেকেই বুঝতে পেরেছেন। সেই হিসেবে রাসূল সাঃ এর দুনিয়াতে কারো মাযহাব অনুসরণের দরকার নাই। কারণ তিনি নিজেইতো শরীয়ত প্রণেতা। তিনিকে অনুসরণ করেই মাযহাব, তাহলে তিনি কেন মাযহাব পালন করবেন।

তিনি কার ব্যাখ্যা গ্রহণ করবেন বা কার অনুসরণ করবেন? তিনি কেবল আল্লাহ তায়ালার থেকেই সমাধান জেনে আমল করেছেন, এবং আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। বরং রাসুল সাঃ এর একটি আমল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে করার কারনে একেকজন মুহাদ্দিসগন একেকটা পালন করেছেন, যার কারনে একেকটা মাযহাব তৈরি হয়েছে। তিনির পথকে মূলত চার ইমাম চারভাবে নিয়ে মানুষকে সঠিক একটি পথে থেকে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি একেকজন একেকভাবে আমল করে তাহলে আমল ছেড়ে দিবে যার কারনে মাযহাব হয়েছে। 

 

সাহাবীদের মাযহাব কি?

সাহাবায়ে কিরাম যারা সরাসরি রাসূল সাঃ এর কাছে ছিলেন তাদের জন্য রাসূল সাঃ এর ব্যাখ্যা অনুসরণ করা ছিল আবশ্যক। এছাড়া কারো ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু যেই সকল সাহাবারা ছিলেন নবীজী সাঃ থেকে দূরে তারা সেই স্থানের বিজ্ঞ সাহাবীর মাযহাব তথা মত অনুসরণ করতেন। যেমন ইয়ামেনে হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর মত তথা মাযহাবের অনুসরণ হত। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের অনুসরণ করতেন ইরাকের মানুষ।

রাসূল সাঃ যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে ইয়ামানে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন-“যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সাল করবে?” তখন তিনি বললেন-“আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা”। রাসূল সাঃ বললেন-“যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?” তিনি বললেন-“তাহলে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাত দ্বারা ফায়সালা করব”। রাসূল সাঃ বললেন-“যদি রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে না পাও?” তখন তিনি বললেন-“তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব”। তখন রাসূল সাঃ তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন-“যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট”। {সূনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৫৯৪, সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং-১৩২৭, সুনানে দারেমী, হাদিস নং-১৬৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২০৬১}

এই হাদীসে লক্ষ্য করুন-রাসূল সাঃ এর জীবদ্দশায় হযরত মুয়াজ রাঃ বলছেন যে, আমি কুরআন সুন্নাহ এ না পেলে নিজ থেকে ইজতিহাদ করব, আল্লাহর নবী বললেন-“আল হামদুলিল্লাহ”। আর ইয়ামেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজের মত তথা মাযহাব অনুসরণ যে আবশ্যক এটাও কিন্তু হাদীস দ্বারা স্পষ্ট।

এছাড়া সাহাবাদের যুগে যে সকল সাহাবাদের মাযহাব তথা মত অনুসরণীয় ছিল। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হল-

হযরত ওমর বিন খাত্তাব রাঃ, হযরত আলী বিন আবু তালিব রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ, হযরত আয়েশা রাঃ, হযরত জায়েদ বিন সাবেত রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ প্রমূখ সাহাবাগণ।

তাবেয়ীদের মাযহাব কি?

তাবেঈরা যেই সব এলাকায় থাকতেন, সেই সকল এলাকার বিজ্ঞ সাহাবীদের বা বিজ্ঞ মুজতাহিদের মত তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন-

হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যিব রহঃ, হযরত ওরওয়া বিন জুবাইর রহঃ হযরত কাসেম বিন মুহাম্মদ রহঃ, হযরত আবু সালমা বিন আব্দির রহমান রহঃ, হযরত সুলাইমান বিন ইয়াসার রহঃ, হযরত খারেজা বিন জায়েদ রহঃ প্রমূখবৃন্দ।

তারপর মদীনায় যাদের মতামত (মাযহাব) অনুসরণ করা হত তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হল- হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ রহঃ, হযরত ইমাম জুহরী রহঃ, হযরত রাবিয়া বিন আব্দির রহমান রহঃ।

আর মক্কা মুকার্রমায় যাদের মতামত (মাযহাব) অনুসরণ করা হত তারা হলেন- আলী বিন আবি তালহা রহঃ, আতা বিন আবি রাবাহ রহঃ, আব্দুল মালিক বিন জুরাইজ রহঃ প্রমূখ।

আর কুফায় যাদের মতামত (মাযহাব) অনুসরণ করা হত তারা হলেন- ছিলেন হযরত ইবরাহীম নাখয়ী, আমের বিন শুরাহবীল, শা’বী, আলকামা, আল আসওয়াদ রহঃ।

আর বসরায় ছিলেন-হাসান বসরী রহঃ। ইয়ামানে হযরত তাওস বিন কায়সান রহঃ। শামে হযরত মাকহুল রহঃ প্রমূখ।

মুহাদ্দিসগন কি মাযহাব মেনেছেন?

এই কথাটি বুঝার আগে একটি কথা আগে বুঝে নিন। সেটা হল-রাসূল সাঃ এর যুগ থেকেই দু’টি দল চলে আসছে, একটি দল হল যারা ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা ইজতিহাদ করতেন তথা মত দিতেন বিভিন্ন বিষয়ে। আর একদল ছিলেন যাদের এই ক্ষমতা ছিলনা, তারা সেই মুজতাহিদদের মতের তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন।

ঠিক একই অবস্থা ছিল সাহাবাদের যুগে। একদল ছিল মুজতাহিদ, যাদের একটি তালিকা ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। আর বিশাল এক জামাত ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তারা সেই সকল মুজতাহিদদের মাযহাব তথা মতের অনুসরণ করতেন। তেমনি তাবেয়ীদের একই অবস্থা ছিল, একদল মুজতাহিদ, আরেকদল মুকাল্লিদ তথা অনুসারী। এমনি মুহাদ্দিসীনদের মাঝেও দুই দল ছিল, একদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন, আরেকদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তাই তাদের মাঝে কারো কারো মাযহাব রয়েছে কারো কারো নেই। কেউ কেউ নিজেই মাসআলা বের করেছেন, কেউ কেউ অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করেছেন।

যেমন ইমাম বুখারী মুজতাহিদ ছিলেন, তাই তার কারো অনুসরণের দরকার নাই। তবে কেউ কেই তাকে শাফেয়ী মাযহাবী বলে মত ব্যক্ত করেছেন। {আল ইনসাফ=৬৭, তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ-২/২, আবজাদুল উলুম—৮১০}

এমনিভাবে ইমাম মুসলিম রহঃ ছিলেন শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। {আল হিত্তাহ-১৮৬}

নাসায়ী শরীফের সংকলক ইমাম নাসায়ী রহঃ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মাযাহাবের অনুসারী ছিলেন।, ইমাম আবু দাউদ রহঃ, ও ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। {ফয়জুল বারী-১/৫৮, আবজাদুল উলুম-৮১০, ইলাউল মুয়াক্কিয়ীন-১/২৩৬}

কেন একটি মাযহাবই মানতে হবে?

কুরআনে কারীম ৭টি কিরাতে নাজীল হয়েছে। কিন্তু একটি কিরাতে প্রচলন করেছেন হযরত উসমান রাঃ। যেটা ছিল আবু আসেম কুফী রহঃ এর কিরাত। এর কারণ ছিল বিশৃংখলা রোধ করা। যেন দ্বীনকে কেউ ছেলেখেলা বানিয়ে না ফেলে। আর সবার জন্য এটা সহজলভ্য হয়।

তেমনি একটি মাযহাবকে আবশ্যক বলা হয় এই জন্য যে, একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের মত করে পালন করত। যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচেছ ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতনা, বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজা হত। তাই ৪র্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে দিয়ে নিজের মত চলাকে বন্ধ করে দিয়েছেন। যা সেই কালের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়।

মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি?

এবার আমরা জানার চেষ্টা করব মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি এতে শুরুতেই আমরা বলেছি মাযহাব মানে মতামত বা অভিমত। প্রত্যেকের মতামত এক রকম হবে এটা আসলে লজিক্যাল না, এটা যৌক্তিক নয়, একেকজনের চিন্তা একেক রকম হবে,একরকম মতের ভিন্নতা বা বুঝের ভিন্নতাবাদ, চিন্তার ভিন্নতা এটার মানুষের মাঝে থাকবে এটাই মানুষের সহজজাত বেপার। এ কারণে একাধিক মতামত কোরআন সুন্নাহর বিষয়ে আমরা পাচ্ছি পাশাপাশি রাসূল সাল্লাল্লাহু ইসলামের পক্ষ থেকেও একটি আমলের ব্যাপারে একাধিক কোন একটি বিষয় একাধিক আমল ও প্রমাণিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে একেক ইমামগন (মুসতাহিদ) একেকটি পদ্ধতি নিয়েছে। যেমন- নামাজে দাড়ানো ক্ষেত্রে নবীজি (সাঃ) কয়েকভাবে কতেকসময় দাড়িয়েছেন। চার ইমামের মধ্যে যার যেভাবে আকৃষ্ট করেছে তিনিরা সেটা প্রচার করেছেন, সকলের মতামতই সঠিক, সকল ইমামের দেখানো পদ্ধতিই সঠিক। তবে যেলোক যে ইমামের মাযহাব মেনেছে সে সেভাবে পালন করে দাড়িয়েছেন।

সাহাবীদের সময়কালে যে কোন বিষয়ে একাধিক মতামত পাওয়া যেত এক্ষেত্রে আমরা সহি বুখারীর একটি বিখ্যাত হাদিস উল্লেখ করতে পারি যেখানে আহযাবের যুদ্ধের প্রসঙ্গটা এসেছে এবং আহযাবের যুদ্ধে যখন মুসলমানরা জয়লাভ করলো আল্লাহ রাসূল সাঃ আহযাবের ওই প্রান্ত থেকে বা খন্দকের প্রান্ত থেকে মদিনায় ফিরে আসার প্ল্যান করছিলেন। তখন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে বললেন ইয়া রাসুল আল্লাহ আপনারা তলোয়ার নামিয়ে ফেলেছেন আমরা তো নামাইনি, আল্লাহ তায়ালা আদেশ দিয়েছেন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আপনি মদিনাতে যাবেন না বরং বনুকুরাইজার দিকে যান, একথা শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম সাহাবীদেরকে বললেন তোমরা সবাই সরাসরি এখান থেকে 

বনু কুরাইজার দিকে চলে যাবে। তোমরা কেউই কিন্তু পথিমধ্যে আছর নামাজ পড়বে না বরং বনুকুরাইজায় পৌঁছে তারপর আসরের সালাত পড়বে। আল্লাহ রাসূল সাঃ বলার সাথে সাথে সাহাবারা চলতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু বনুকুরাইজা পৌছানোর আগেই পথের মধ্যে আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। তখন কিছু সাহাবি বলল আমরা এখানেই আসর পড়ে ফেলবো, আবার কিছু সাহাবী বললেন যে রাসূল সাঃ আমাদেরকে বনুকুরাইজা পৌছানোর পর আসর পরতে বলেছেন। তাই কিছু সাহাবী আসরের সময় হওয়াতে পথে মধ্যে পড়ে ফেললেন আর কিছু লোক দেরি হলেও বনুকুরাইজা গিয়ে আসর পড়লেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন রাসুল (সাঃ) আসলেন তখন ঘটনাটি বললেন, কিছু সাহাবী পথে মধ্যে নামাজ পড়েছেন নামাজের সময় হওয়াতে আর কিছু সাহাবী বনুকুরাইজা পৌছে আসর পড়েছেন। তখন রাসুল (সাঃ) কথাটি শুনে কারোকে কোন কিছু বলেননি, চুপ করে রইলেন।

তারমানে দুইজনই ঠিক ছিল, যদি দুইপক্ষই সঠিক না হত তাহলে ভুল ধরিয়ে দিতেন।

এভাবে করে দুটি মত তৈরি হয় সাহাবিদের মাঝেও।

((এখানে আমার অভিমত হলো রাসুল সাঃ এর আদেশটি যারা পালন করেছেন তারাই ইমামের নেতৃত্ব ভালভাবে মেনেছেন, রাসুল (সাঃ) এর কথা মানাও আল্লাহর কথা মানা, এবং যারা পথেমধ্যে নামাজ পড়েছেন তারা আল্লাহর আদেশকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা নামাজের সময়ে নামাজ পড়ে নিতে হবে, কিন্তু দুজনই সঠিক ছিল।))

কুরআন হাদীস দেখে আমল করলে অসুবিধা কোথায়?

কি কি অসুবিধা তা আশা করি “মাযহাব মানা প্রয়োজন কেন” এই পয়েন্টে তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তরে পেয়ে গেছেন। আপনি সরাসরি কুরআন ও হাদিস দেখে আমল করতে চাইলে আপনাকে অনেক অনেক গবেষনা করতে হবে, যা আপনার সারাজীবন লেগে যেতে পারে শুধু মাত্র কিছু সংখ্যকের উপর গবেষনা করলেই। আপনাকে ইমামদের মত পান্ডিত্য অর্জন করতে হবে। তবে আরেকটি কথা হলো এখন যেহেতু আর কেউ সাহাবীদের সাক্ষাত পাওয়া সম্ভব নয়, এখন যেহেতু তাবেয়ীন হওয়া সম্ভব নয়, তাই আর কেউ মাযহাব তৈরি করাও সম্ভব নয়, আর কেউ সরাসরি কোরআন হাদিস থেকে সরাসরি আমল করবে তাও সম্ভব নয়। কারণ হলো যারা মাযহাব তৈরি করেছিল তাদের মধ্যে সাহাবীদের সাক্ষাত পেয়েছিল কোন কিছু না বুঝলে জিজ্ঞাসা করে নেওয়ার জন্য। তারপরও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজেই একজন তাবেয়ীন। তিনি তাবেয়ীন হয়ে তাঁর মতামতের উপর ভিত্তি করে মাযহাব প্রতিষ্ঠীত তাই আর কেউ পৃথিবীতে তিনির জায়গা দখল করতে পারবে না।

ইজতিহাদ ও তাকলীদের ফলেই ইসলাম কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের সবাইকে সব জিজ্ঞাসার জবাব এবং সব সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। যেমন ধরুন, মাজহাব কী জন্য অপরিহার্য। ওযু, নামাজ ইত্যাদি বিষয়ের ফরজ, সুন্নত, মুস্তাহাব ও মাকরুহ কী কী, স্পষ্টভাবে কোরআন-হাদিসে তা উপযুক্ত কারণেই উল্লেখ না থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য তা বের করে আমল করা অসম্ভব।

তাই তাদের জন্য সহজ পথ হলো, কোরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ যেসব মুজতাহিদ ইমামগণ কোরআন ও হাদীস ঘেঁটে এসব বিষয় বের করে দিয়েছেন, তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুপাতে ইসলামী শরীয়ত অনুসরণ করা। এরা ছিলেন স্বর্ণযুগের মানুষ। এদের গবেষণার উপকার ভোগ করার নামই হলো মাজহাব অনুসরণ। আর দীনের এমন প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞকে অনুসরণের কথা কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে এসেছে। যেমন, যে (ইলম তাকওয়া ও ইখলাসের সাধনায়) আমার নৈকট্যশীল হয়, তার দেখানো পথ (মাজহাব) অনুসরণ করবে। (সুরা লুকমান : ১৫)।

মাযহাব কয়টি ও কী কী

আমাদের মাঝে চারটি মাযহাব প্রচলিত আছে। যা চারজন ইমামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাম গুলো হলো-হানাফী মাযহাব, মালিকি মাযহাব, শাফি মাযহাব, হাম্বলী মাযহাব। নিম্নে চারজন ইমাম নিয়ে আলোচনা করব এবং তিনিদের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব গুলো কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে বিষয়েও আলোচনা করব। চার মাযহাব কি কি বিস্তারিত জানতে পারবেন।

চারটি বিখ্যাত মাযহাব কি করে প্রতিষ্ঠিত হলো?

(হানাফী মাযহাব, মালিকি মাযহাব, শাফি মাযহাব, হাম্বলী মাযহাব)

হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ফিকহশাস্ত্রের উদ্ভাবক)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর নাম নোমান, উপনাম আবু হানিফা। তিনি একজন তাবেয়ি। হিজরি ৮০ সনে, মোতাবেক ৭০০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি তীক্ষধী-শক্তির অধিকারী ছিলেন। একসময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একান্ত খাদেম ও প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আনাস (রা.) কুফায় আগমন করলেন ইসলামের শিক্ষা প্রচার করার জন্য। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)  অল্প বয়সে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁকে দেখে বাল্য বয়সেই তাবেয়ি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে জ্ঞানার্জনে আত্মনিযোগ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইলমে কালামে পূর্ণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। অতঃপর পবিত্র কোরআন ও হাদিসের জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অসংখ্য গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম, বিশিষ্ট আবেদ ও অতিশয় বুদ্ধিমান।

তিনি ফিকহশাস্ত্রের উদ্ভাবক। তাঁর ৪০ জন সুদক্ষ ছাত্রের সমন্বয়ে একটি ফিকহ সম্পাদনা বোর্ড গঠন করেন। এ বোর্ডের মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর কঠোর পরিশ্রম করে ফিকহশাস্ত্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র হিসেবে রূপদান করেন। যখন বোর্ডের সামনে কোনো একটি মাসয়ালা পেশ করা হতো। অতঃপর সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা লিপিবদ্ধ করা হতো। এভাবে ৯৩ হাজার মাসয়ালা কুতুবে হানাফিয়াতে লিপিবদ্ধ করা হয়।

মালিকি মাযহাব (ইমাম মালেক (রহ.) মদিনার ইমাম)

ইমাম মালেক (রহ.)  নাম মালেক, উপনাম আবু আবদুল্লাহ, উপাধি ইমামু দারিল হিজরাহ। তিনি ৯৩ হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে মদিনা ছিল কোরআন ও হাদিস শিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা ইন্তেকাল করলেও তাঁদের বংশধরের বেশির ভাগ এখানেই বসবাস করেন। তিনি এখানেই জ্ঞানার্জন করেন। আবদুর রহমান ইবনে হরমুজ (রহ.)-এর কাছে তিনি হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। অতঃপর ইমাম জুহরি (রহ.), নাফে (রহ.), ইবনে জাকওয়ান (রহ.) এবং ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রা.)-এর কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেন। হিজাজের ফকিহ রাবিয়াতুর রায় (রহ.)-এর কাছে তিনি ফিকহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। স্বীয় ওস্তাদদের থেকে রেওয়ায়াত ও ফতোয়া দানের সনদপ্রাপ্তির পর ফতোয়ার আসন সমাসীন হন। ৭০ বছর বয়সে তিনি অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। মসজিদ-ই-নববী ছিল তাঁর পাঠদানের জায়গা। বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য জ্ঞানপিপাসু তাঁর কাছে আসত। ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.) একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফিকহবিদ ও মুজতাহিদ ছিলেন। তিনি সুদীর্ঘ ৫০ বছরকাল শিক্ষা ও ফতোয়া দানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। প্রিয়নবী (সা.)-এর সম্মানার্থে তিনি মদিনায় পাদুকা ব্যবহার করতেন না এবং বাহনে চড়তেন না। তিনি বলতেন, যে জমিনে প্রিয়নবী শায়িত আছেন, সে জমিনে আমি বাহনে চড়তে লজ্জাবোধ করি। তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত করা হয়।

 শাফেয়ি মাজহাব (ইমাম শাফেয়ি (রহ.) নাসিরুল হাদিস)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু আবদুল্লাহ, নিসবতি নাম শাফেয়ি, তাঁর পূর্বপুরুষ শাফেয়ি (রহ.)-এর নামানুসারে তিনি শাফেয়ি নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ১৫০ হিজরি মোতাবেক ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ফিলিস্তিনের আসকালান প্রদেশের গাজাহ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। কারো কারো মতে, যেদিন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইন্তেকাল করেন সেদিনই ইমাম শাফেয়ি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন।

দুই বছর বয়সের সময় তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে তাঁর মাতাই তাঁকে লালন-পালন করেন। বাল্যকালে তাঁর মাতা তাঁকে নিয়ে পবিত্র মক্কা শরিফে গমন করেন। সাত বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন মজিদ হিফজ করেন এবং ১০ বছর বয়স মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক মুখস্থ করেন। অতঃপর মক্কা শরিফের বিশিষ্ট জ্ঞানপণ্ডিত মুসলিম ইবনে খালিদ জানজি (রহ.) ও সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না (রহ.)-এর কাছে ফিকহ ও হাদিসশাস্ত্র শিক্ষা করেন। ১৫ বছর বয়সে তাঁর ওস্তাদ তাঁকে ফতোয়া দানের অনুমতি দেন, তবে তিনি ওস্তাদের সার্টিফিকেট নিয়ে ইমাম মালেক (রহ.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাঁর কাছে ফিকহশাস্ত্র শিক্ষা করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ইরাক, মিসর ইত্যাদি দেশ সফর করেন। ইরাকে গিয়ে তিনি ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর নিকট ফিকহ হানাফি শিক্ষা করেন। এভাবে তিনি মালেকি ও হানাফি মাজহাবের নিয়ম-কানুন আয়ত্ত করে ত্রিমুখী জ্ঞানের অধিকারী হয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি হানাফি, মালেকি ও মুহাদ্দিসদের মাজহাব মিলিয়ে মধ্যমপন্থী এক মাজহাব, তথা শাফেয়ি মাজহাব প্রবর্তন করেন। তিনি সে মতে গ্রন্থ রচনা করেন, লোকদের শিক্ষা দেন এবং এ মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করেন। তিনি মিসরে গমন করেন। মিসরে তাঁর মাজহাব সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ছিলেন সর্ববিষয়ে যুগশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর দক্ষতার জন্য ইরাকবাসী তাঁকে ‘নাসিরুল হাদিস’ তথা হাদিসের সহায়ক উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনিকে মিসরের ফুসতাতে সমাহিত করা হয়।

হাম্বলি মাজহাব (ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) হাফেজে হাদিস)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এর নাম আহমদ, উপনাম আবু আবদুল্লাহ, উপাধি শায়খুল ইসলাম ও ইমামুস সুন্নাহ, বংশগত পরিচয় সায়বানি। তিনি হিজরি ১৬৪ সনে রবিউল আউয়াল মাস মোতাবেক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিন বছর বয়সে তিনির পিতা মারা যাওয়ার পর তিনি স্বীয় মাতার তত্ত্বাবধানে প্রথমে কোরআন মজিদ হিফজ করেন। সাত বছর বয়স থেকে তিনি হাদিস অধ্যয়ন শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে বাগদাদ নগরী ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রসিদ্ধ নগরী। এ নগরী তখন বহু জ্ঞানী, গুণী, ফকিহ ও হাদিসশাস্ত্রবিদের পদচারণে মুখরিত ছিল। ফলে দ্বিনি জ্ঞান লাভ করা তাঁর জন্য খুবই সহজ ছিল। স্থানীয় বড় বড় আলেমের কাছে নানা বিষয়ে জ্ঞানলাভের পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ইয়েমেন, কুফা, বসরা, মক্কা, মদিনা, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে ভ্রমণ করেন। তিনি হাম্বলি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর ফিকহ অত্যন্ত সহজ ও সরল। তিনি প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি মাত্র চার বছর বয়সে কোরআন মাজিদ হিফজ করেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, আল্লাহভীরু, পরহেজগার; মুত্তাকি এবং বড় আবেদ। দ্বিনের প্রতি ছিল তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস। একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য হাদিস গ্রন্থ প্রস্তুতকল্পে তিনি অকল্পনীয় পরিশ্রম করেন। এ মর্মে তিনি প্রথমে বিভিন্ন সূত্রে সাড়ে সাত লক্ষাধিক হাদিসের এক বিশাল ভাণ্ডার সংগ্রহ করেন। অতঃপর দীর্ঘ সময় ব্যয় করে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে একটি হাদিস গ্রন্থ রচনা করেন, যা মুসনাদে আহমদ নামে সুপরিচিত। তিনি ২৪১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল, মোতাবেক ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন।

মাযহাবের চার ইমামের মাঝে সম্পর্ক কেমন ছিল?

আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে এমন কিছু মনীষী প্রেরণ করেছেন, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষ সত্যের দিশা পেয়েছে। এই মনীষীদের মধ্যে চার মাজহাবের চার ইমাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক ছিল। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ছাত্র হলেন ইমাম মালেক (রহ.), তাঁর ছাত্র ইমাম শাফেয়ি এবং তাঁর ছাত্র ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)।

সে সময় ইমামদের মধ্যে অত্যান্ত শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান ছিল। তিনিদের মধ্যে কোন ধরনের সাংগর্ষিক ছিল না। তিনিদের যার যার মতামতে দৃঢ়তা থেকেও অন্য ইমামদের মতামতকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন।

একসাথে চারটি মাযহাব মানা যাবে কি

একসাথে চারটি মাযহাব মানা যাবে কি যদি প্রশ্ন করে থাকেন। তাহলে বলব অবশ্যই মানতে পারবেন না, কারণ হলো ধরুন চারটি নৌকা ভ্রমনে বের হলো তাদের গন্তব্য স্থান একটিই। আপনি চাইলে চারটি নৌকাতে থাকতে পারবেন না। যেকোন একটি নৌকাতে থাকতে হবে। চারটি নৌকাতে যেমন একজনের পক্ষে থাকা সম্ভব নয় ঠিক তেমনি চার মাযহাব একসাথে পালন করা সম্ভব নয়। আপনাকে যেকোন একটি নৌকাতে যেমন উঠতে হবে ঠিক তেমনি যেকোন একটি মাযহাব (মতামত) মানতে হবে। এখানে আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন-আপনি একটি অংক করতে বসলেন কিন্তু অংকটি চারভাবে করা যাবে, মানে চারভাবে করলে ফলাফল একই রকম হবে। কিন্তু আপনি শুধু একভাবেই অংকটি করতে হবে। আপনি পরিক্ষায় একটি পদ্ধতিই ব্যবহার করতে হবে।

মাযহাব নিয়ে আমাদের সমাজে এখন বাড়াবাড়ি চলছে কেন?

কুরআন-হাদীস থাকতে আমরা মাজহাব কেন মানব?এমন অভিনব ধরনের প্রশ্ন ইদানীং অনেকে করে থাকেন। দীর্ঘ ১৪০০ বছর এমন প্রশ্ন কোনো মুসলমান করেননি। যারা মাযহাব সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান রাখেন তারা কখনোই মাযহাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। মত প্রকাশের সাধীনতা সর্বকালেই ছিল কিন্তু কোন কালেই মাযহাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেননি। মাযহাব হল ইসলামের সহী মত প্রকাশ করাকে বুঝায়। মাযহাব ইসলামের বাহিরে কোন কিছু নয়। আমাদের দেশে মাযহাব কথাটির অর্থ না বুঝার কারণেই যত সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে। দ্বীনের অবুঝ সরল মানুষদের মাযহাব বলতে আলাদা নাম বুঝাচ্ছে। মাযহাব মানে পথ বা মতামত যা ইসলামের পথ বা ইসলামের মতামত।

একটি তথ্য দিয়ে থাকি, যেমন- বর্তমানে ইসলামিক বিশ্ব বিদ্যালয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল আল আজহার বিশ্ব বিদ্যালয়। যদি কেউ সেখানে পড়াশুনা করতে যায় তাহলে তাকে যেকোন একটি মাযহাব মানতে হবে। যদি ছাত্র কোন মাযহাব মানে বলতে না পারে তাহলে তাকে ভর্তিই নিবে না। কারন বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃক বিশ্বাস করে কেউ যদি কোন একটি মাযহাব না মানে তাহলে সে সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে। যার কারনে দেখবেন এই বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ার শর্ত হচ্ছে আপনাকে যেকোন একটি মাযহাবের অনুসারি হতে হবে।

সর্বশেষ কথা হলোঃ

সুনির্দিষ্ট একটি মাজহাব মানা ছাড়া সাধারণ মুসলমানদের কোনো গত্যন্তর নেই। অতএব আলেম বা সাধারণ উম্মতের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি মাজহাব মানা ওয়াজিব।

প্রশ্ন মাযহাব মানা কি মুফতি আলাউদ্দিন জিহাদী

মাযহাব মানা কি ফরজ

মাজহাব মানতে হবে, মিজানুর রহমান আজহারি

আরো পড়ুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *