আর্জেন্টিনা ফুটবল দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় নেই কেন?

By | January 2, 2023

দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের ফুটবল দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় চোখে পড়লেও আর্জেন্টিনায় দেখা যায় না। ব্রাজিলের পেলে থেকে শুরু করে রিভালদো, রোনালদিনহো কিংবা নেইমার, কেউই শ্বেতাঙ্গ নন। চিলির তারকা ফুটবলার ভিদাল কিংবা কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি তাই। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও একই চিত্র নজরে পড়বে। 

 

তবে ব্যতিক্রম কেবল আর্জেন্টিনা। দলটির ফুটবল দলে চোখে পড়ে না কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। তবে কি দেশটিতে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী নেই? জরিপে দেখা যায়, সেখানে ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যক্তির দেহে আফ্রিকান জিন রয়েছে।

 

২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আর্জেন্টিনায় কালো মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। একটা সময় দেশটির জনসংখ্যার বেশ বড় অংশ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু যুদ্ধ আর মহামারির পাশাপাশি লজ্জাজনক ইতিহাস আর্জেন্টিনা থেকে নির্মূল করে কৃষ্ণাঙ্গদের।

 

রাজধানী বুয়েনোস আইরেস থেকে এক হাজার কিলোমিটার উত্তরের শহর করিয়েন্তেসে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর উদযাপন করা হয় এক বিশেষ উৎসব, স্যান বালতাজার। এই উৎসবের সবকিছুই এসেছে কৃষ্ণাঙ্গদের সংস্কৃতি থেকে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে চিরুনি দিয়ে খুঁজলেও কোনো কৃষ্ণাঙ্গকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ, যুগ যুগ ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের মুছে দেয়া হয়েছে আর্জেন্টিনার ইতিহাস থেকে।

 

করিয়েন্তেস শহরের কামা কুয়া কুয়া এলাকায় রাইমুন্দো মোলিনা নামের এক স্প্যানিশ জমিদার থাকতেন। তার অধীনে ছিল প্রচুর কৃষ্ণাঙ্গ দাস। নৃতত্ত্ববিদ মারিয়া বেলেন জানিনোভিচ এই বাড়ি থেকেই প্রচুর আফ্রিকা থেকে উদ্ভূত জিনিস পেয়েছেন। যার সঙ্গে মিশে রয়েছে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাড়িটিতে কাজ করা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের ইতিহাস।

 

নৃতত্ত্ববিদ জানিনোভিচ জানান, শহরের সবাই এখন শ্বেতাঙ্গে পরিণত হয়েছে। তারপরও কারো কারো কোঁকড়া চুল আর কানের গোড়া দেখলে বোঝা যায়, তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন।

 

এরকমই একজন স্যান বালতাজার উৎসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত অসভালদো কাবায়েরো। তার মতে, পূর্বপুরুষ কৃষ্ণাঙ্গ দাস ছিল এমন পরিচয় দিলে সামাজিক মর্যাদা কমিয়ে দেয়। এ কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের বংশধররা পূর্বপুরুষদের ইতিহাস গোপন রাখতে চায়।

 

ইতিহাসবিদ ফেলিপে পিগনা জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কৃষ্ণাঙ্গদের জোর করে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে দেয়া হতো। আর সবার আগে তাদের সামনে রাখা হতো। ফলে যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ মারা যায়। একই ধারা চলতে থাকে গৃহযুদ্ধের সময়ও। মহামারির কবলে পড়ে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী কমে আসে আরও। নারী-পুরুষ অনুপাতের ব্যবধান বেড়ে যায় অনেক। প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, বলিভিয়াতেও পাঠিয়ে দেয়া হয় অনেক দাসকে।

 

এছাড়া আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্মহারও ছিল তুলনামূলক কম। মালিকরা দাস-দাসিদের বিয়ে করতে অথবা বাচ্চা নিতে দিত না। কারণ গর্ভবতী হয়ে পড়লে নারীরা কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া আর্জেন্টিনার সাদা নেতারাও কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে কাজ করে গেছে।

 

আর্জেন্টিনার বহু শ্বেতাঙ্গ নেতা মনে করতেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর সমমর্যাদায় উন্নীত হতে চাইলে যেকোনো উপায়ে কালো মানুষদের হাত থেকে তাদের নিস্তার পেতে হবে।

 

বর্তমানে আর্জেন্টিনায় যাদের নিগ্রো বলা হয়, তারা মূলত শংকর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তারা নিজেদের সাদা বানানোর চেষ্টা করেছে। কারণ সামান্য কৃষ্ণাঙ্গ জিনও তাদের সামাজিক মর্যাদা কমিয়ে দিতে পারে কয়েকগুণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *