প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতার ফসল পদ্মা সেতু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি পেয়েছিল প্রথমবারের মতো স্বাধীন-সার্বভৌম এক দেশ, লাল-সবুজের পতাকা, যার নাম বাংলাদেশ।  বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা পেলাম পদ্মা সেতুর মতো অনন্য এক স্থাপনা। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মনে দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন প্রোথিত ছিল, তা আজ আর স্বপ্ন নয়, সূর্যের আলোর মতো বাস্তব।  এই বাস্তব স্বপ্নপূরণের অগ্রযাত্রায় সর্বদা আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখিয়েছেন আমাদের আশাজাগানিয়া আস্থার প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আর কূটচাল ছিল প্রথম থেকেই। অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন আর শেখ হাসিনার অনমনীয় দৃঢ়তা, মনোবল আর ঐকান্তিক ইচ্ছায় ছোট ছোট পিলারে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, প্রমত্ত পদ্মায় আজ দাঁড়িয়ে আছে পদ্মা সেতু। এক সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতোই পদ্মা সেতু এখন দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আবেগের নাম আর প্রধানমন্ত্রী সেই ভালোবাসার বাতিঘর। একটু একটু করে শত প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে আজ পদ্মা যেন সব সম্ভাবনাকে আহ্বান করছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাটি খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করতে হয়- ‘সাবাশ, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়;/ জ¦লে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ বাংলাদেশ তা পেরেছে কবির কল্পনায় বাস্তবে আজ রূপ পেয়েছে।


 

বৃহত্তর বরিশাল এবং খুলনা বিভাগসহ দেশের একুশটি জেলাকে যে সেতুটি একত্রিত করেছে, যোগাযোগের নতুন দিগন্ত স্থাপন করেছে সেটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দক্ষিণাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি জাতির পিতার স্বপ্নের সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পদ্মা সেতু সহায়ক হবে বলে আমরা আশাবাদী।

আজ যে সেতুটি দৃশ্যমান বাস্তব, এটি সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার মতো দূরদর্শী এক নেতার অদম্য প্রচেষ্টায়। শুরুতেই ছিল অনেক বাধা, ছিল অনিশ্চয়তা এবং অসংখ্য প্রতিকূলতা। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেছিলেন, ‘বিশ^জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’ প্রধানমন্ত্রীও যেন করেছিলেন সে রকম পণ, পদ্মা সেতু তিনি বাস্তবায়ন করবেন।

২০১২ সালের ২৯ জুন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। এ প্রকল্প থেকে সরে যায় এডিপি, জাইকা এবং আইডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগীরাও। দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ এনে সরকারের জনপ্রিয়তাকে খাটো করাই ছিল আরও একটি উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক ঋণচুক্তি বাতিল বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদই হয়েছে। বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মতো একটি বৃহৎ বহুমুখী সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। বাংলাদেশ অহঙ্কার নিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে। এই জয় এ দেশের আপামর সাধারণের জয়, শেখ হাসিনার জয়। বঙ্গবন্ধুকন্যাও সব ষড়যন্ত্রকে পায়ের তলার ভৃত্য বানিয়ে নিজ লক্ষ্যে থেকেছেন অটল ও অবিচল। যখন বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী ঋণচুক্তি স্থগিত করলে একমাত্র প্রধানমন্ত্রী অনড় ছিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন পদ্মা সেতু অবশ্যই হবে এবং সেটা নিজস্ব অর্থায়নেই হবে। জনগণের জন্য জনগণের টাকায় এই সেতু হবে। সব ষড়যন্ত্র, বাধা ও সমালোচনা অতিক্রম করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু ঠিকই চালু হতে যাচ্ছে। এই সেতু আমাদের গর্ব, অহঙ্কার।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় আজ আমরা পদ্মা সেতুকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছি আমরা। দেশের নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেটা এখন প্রমাণিত।

একটা সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হতো দক্ষিণবঙ্গের মানুষদের। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একুশটি জেলার মানুষ এখন অল্প সময়ের মধ্যে রাজধানী শহর ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। বাঁচবে সময়, লাঘব হবে কষ্টের। পদ্মা বহুমুখী সেতু শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটাবে না, মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থারও উন্নয়ন ঘটাবে।

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে শুধু যোগাযোগব্যবস্থারই নয়, উৎপাদিত কৃষি ও শিল্পজাত পণ্য সহজে ও দ্রুত সময়ে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষকরা যেমন তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমন বাড়বে কৃষি উৎপাদনও। গ্যাস, বিদ্যুৎ নিত্যনতুন সংযোগের ফলে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা তৈরি হবে এবং বাণিজ্যকেন্দ্র বৃদ্ধি পাবে। মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। মোংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র তৈরি হবে যা দেশের জিডিপি ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। শুধু তা-ই নয়, পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে পুরো দেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনের পথকে আরও সুগম করবে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু আমাদের অহঙ্কার আর গর্বের, নিজেদের সমতাকে মাথা উঁচু করে প্রকাশ করার প্রতীক। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের, ‘ধন ধান্যে পুষ্পেভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’র বাংলাদেশ। যার সম্পর্কে কবি বলেছেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকে তুমি/ সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’

বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত চাপ, মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের কিছু লোকের বক্তৃতা-বিবৃতিকে উপেক্ষা করে দৃঢ়তা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক নতুন অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই দেশ একদিন সোনার বাংলা হবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে দেওয়ার পথে দৃঢ়চেতা শেখ হাসিনার জয়ের এক আখ্যান আমাদের পদ্মা সেতু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি সাহস আর দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে যে কতশত অন্তরে আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছেন তা কেবল সেই সব মানুষই উপলব্ধি করতে পারবে। আর তাই দক্ষিণবঙ্গের মানুষ হিসেবে আপনার এই অগ্রযাত্রায় শামিল হতে পেরে আমরাও গর্বিত। আমাদের টাকায় আমাদের পদ্মা সেতু হয়েছে। স্বপ্নের জয় হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের জয় হয়েছে। জয় পদ্মা সেতুর জয়। জয় শেখ হাসিনার জয়।

সুমনা গুপ্তা : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়