পদ্মা সেতু : সমৃদ্ধির দখিনা দুয়ার

২৫ জুন নিজস্ব অর্থায়নে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাঙালির আত্মবিশ্বাসের সেতু ‘পদ্মা সেতু’। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরসহ কোটি বাঙালির প্রাণের উচ্ছ্বাস এই পদ্মা সেতুকে ঘিরে।এই বাঁধভাঙা তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের পেছনে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মেলবন্ধন।

দুদিন আগেও মাঝিরঘাটে একটি স্পিডবোটের সঙ্গে লঞ্চের সংঘর্ষে ১৩ জন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট ডুবে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় ১৩ জন যাত্রীকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।নিশ্চিতভাবে এই বেঁচে যাওয়ার খবর আমাদের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। কিন্তু সব সময় আমরা এই প্রশান্তির খবর পাই না। বিগত সপ্তাহে দুটি ফেরির সংঘর্ষে একজন নিহত এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

এর আগে ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। সরকারি হিসাবে সে সময় ৪৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং নিখোঁজ থাকে ৬৪ জন। এ ছাড়া পদ্মায় প্রাণহানির খবর প্রায়ই পাওয়া যায়।প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলো খরস্রোতা পদ্মার স্বজন কেড়ে নেওয়ার স্মৃতি বয়ে বেড়ায় যুগের পর যুগ।


 

এখন পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সমৃদ্ধির ছোঁয়া পাবে। এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভাবনা, তারা আর পদ্মার ঢেউয়ের তীব্রতায় স্বজন হারাবে না, রাত বিরাতে অসুস্থ হলেও তারা নিজেরা এবং তাদের পরিবার দ্রুতই জরুরি চিকিৎসা সেবা পাবে।সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পদ্মা পাড়ে সংকটাপন্ন রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি আর দেখতে হবে না।

কৃষিক্ষেত্রেও দেখা যাবে সমৃদ্ধির ছোঁয়া। কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চল থেকে সহজেই কৃষি পণ্য পৌঁছে যাবে ঢাকাসহ সারা দেশে। কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং ক্রেতা পাবেন সতেজ ও টাটকা পণ্য।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া ও কালোজিরার মতো মসলার  আবাদ হয়।পেঁয়াজ একদিকে যেমন আমদানি করতে হয়, অন্যদিকে পেঁয়াজ উৎপাদন করে প্রান্তিক চাষিরা ন্যায্য মূল্য পায় না। এখন এই কৃষকরা সহজেই তাদের পণ্য নিয়ে নিজেরাই ঢাকা যেতে পারবেন। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব কৃষিপণ্য রাতারাতি চলে আসবে ঢাকা।

কৃষির মতো একই রকম উন্নয়ন হবে মৎস্য এবং পোলট্রি শিল্পে। সামুদ্রিক মাছ এবং সাধু পানির মাছের ট্রাক আর দিনের পর দিন ফেরি ঘাটে অপেক্ষা করবে না।

ইতোমধ্যেই সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে পরিবহন খাতে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যানসহ অন্যান্য পরিবহন। এই শিল্পের বিকাশে একদিকে যেমন জিডিপি বাড়বে, অন্যদিকে বাড়বে কর্মসংস্থান।পদ্মা সেতুর উভয় প্রান্তে গড়ে উঠছে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

ইস্পাত, সিমেন্ট, পোশাক শিল্পের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে পদ্মা সেতু। এতে মানুষ ঢাকামুখী হওয়ার পরিবর্তে নিজ ঘরে ফিরবে এবং ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমবে।

ইতোমধ্যেই পদ্মা সেতু হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।

সর্বোপরি পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার সকল ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির দক্ষিণা দুয়ার হিসেবে প্রশান্তির এনে দেবে।

লেখক :মো. কামরুল হাসান সোহেল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা্ (ইউএনও), জাজিরা, শরীয়তপুর।