কান উৎসবে এক টুকরো বাংলাদেশ রেহানা মরিয়ম নূর

প্রধান চরিত্রের পুরো নামটিই সিনেমার নাম। রেহানা মরিয়ম নূর। তবে এর অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বোঝা যাবে একদম সিনেমার শেষ দৃশ্যে গিয়ে। তার আগ পর্যন্ত মেডিসিনের এই তরুণ সহকারি অধ্যাপক, যিনি একজন বিধবা, যার প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া একটি মেয়ে রয়েছে, তাকে মনে হবে নরক থেকে উঠে আসা এক গোঁয়ার শিক্ষক।


কান চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা দেখার পর এমনই বর্ণনা দিয়েছেন পর্যালোচক ডেবোরা ইয়ং। গল্পটি বাংলাদেশের। সিনেমার নাম ‘রেহানা মরিয়ম নূর’।

 

একদিকে সমাজের আশপাশে নিত্য ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়ে নিজে কিছু করতে না পারার যাতনা, অন্যদিকে শিক্ষক-চিকিৎসক-মা-মেয়ে-বোন – এমন নানা চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে নারীদের প্রতিনিয়ত যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সফল অভিনেত্রীর তকমা জোটা বাঁধন এখানে বাস্তবের রেহানা হয়েই ফুটে উঠেছেন৷


প্রথমবারের মতো পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ ফ্রান্সের কানের পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সাল দুবুসি প্রেক্ষাগৃহে হয়ে গেল বাংলাদেশের সিনেমা রেহানা মরিয়ম নূর সিনেমার প্রিমিয়ার। বুধবার বাংলাদেশ সময় বেলা সোয়া ৩টা সিনেমার প্রথম প্রদর্শনী হয়। এতে দারূনভাবে প্রশংসিত হয়েছে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। তরুণ নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পরিচালনায় সিনেমাটি কানে দর্শকদের দেখানোর পর ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ পেয়েছে।

 

প্রিমিয়ারে অংশ নেন সিনেমার সিঙ্গাপুরের প্রযোজক জেরেমি চুয়া, নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু, পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন তমিজুল, প্রোডাকশন ডিজাইনার আলী আফজাল উজ্জল, কালারিস্ট চিন্ময় ও সাউন্ড ডিজাইনার শৈব তালুকদার। 

 

প্রায় পৌনে ২ঘন্টার সিনেমাটির শুরু থেকে শেষ অবধি হল ভর্তি দর্শক দেখেছেন পিনপতন নিরবতায়। ছবিটি শেষ হওয়ার পর দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং হাত তালিতে মুখর করেন ডবসি থিয়েটার। এসময় সেখানে উপস্থিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’র পুরো টিম আবেগে ভাসেন।

 

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ প্রদর্শনী শেষে হল থেকে বেরিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, এটা শুধু ‘রেহানা মরিয়ম নূর’র সঙ্গে জড়িতদের একার সম্মান নয়, এটা আসলে আমাদের পুরো বাংলাদেশের সম্মান। আমরা দেশটাকে সাথে করে নিয়ে এসেছি। 

 

বাঁধন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দর্শক আমাদের স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়েছে। সেই সাথে সবার হাততালিতে মুখরিত ছিলো হল রুম। এটা অসাধারণ এক অনুভূতি, বলে বোঝাতে পারবো না।

 

এর আগে প্রিমিয়ারের আগে আট সদস্যের দলটি দাঁড়িয়েছিল রেড কার্পেটে। সেখানে ছবি তুলেছেন তারা। এক সঙ্গে দাড়িয়ে তোলা একটি ছবি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে সবার দোয়া চান অভিনেত্রী বাঁধন। এবারই প্রথম বাংলাদেশের কোনো সিনেমা কানের মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে এবং তার প্রিমিয়ার হল।

 

উৎসবের অঁ সর্তে রিগা বিভাগের সিনেমা হিসেবে প্রতিযোগিতা করছে রেহানা মরিয়ম নূর। বিভাগটির প্রথম সিনেমা হিসেবে প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্রটি এবং বুধবারের প্রথম সিনেমাও এটি। বিভাগে আরও ১৯টি সিনেমা রয়েছে। 

 

সাধারণত ভিন্ন চিন্তার সিনেমাগুলো জায়গা পায় অঁ সর্তে রিগা বিভাগে। একই সঙ্গে পরিচালকের প্রথম বা দ্বিতীয় সিনেমাকে এ বিভাগে সুযোগ দেয় কর্তৃপক্ষ। উৎসব চলবে ১৭ জুলাই পর্যন্ত। অঁ সর্তে রিগা বিভাগের পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৬ জুলাই।

 

মেডিক্যাল কলেজের একজন শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করেই এই সিনেমার গল্প। যেখানে রেহানা একজন মা, মেয়ে, বোন ও শিক্ষক হিসেবে জটিল জীবনযাপন করেন। এর মধ্যে এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় রেহানা একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হন। এরপর থেকে সে এক ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মী এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করতে শুরু করেন এবং ক্রমেই একরোখা হয়ে ওঠেন। 

 

কিন্তু একই সময়ে তার ৬ বছর বয়সী মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল থেকে রূঢ় আচরণের অভিযোগ করা হয়। এমন অবস্থায় অনড় রেহানা তথাকথিত নিয়মের বাইরে থেকে সেই ছাত্রী ও তার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচারের খোঁজ করতে থাকেন।

 

এদিকে, কানে প্রথমবার বাংলাদেশের কোনো সিনেমা অফিশিয়ালি নির্বাচিত হয়েছে। জুন মাসের শুরু থেকেই সেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভাসছে বাঙালি সিনেমাপ্রেমী সহ এই সিনেমা সংশ্লিষ্টরাও। কিন্তু যিনি সিনেমাটির মূল কাণ্ডারি, তারই ছিলো না কোনো খবর! কানের ‘আনসার্টেন রিগার্ড’ বিভাগে স্থান করে নেয়া ‘রেহানা মরিয়ম নূর’- এর নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। কানে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সবাই তাকে খুঁজলেও কোথাও পাওয়া যায়নি সাদকে। গণমাধ্যম তো দূর, তাকে খোঁজে পাওয়া যায়নি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো শাখায়! এমনকি প্যারিসে গিয়ে দশ দিন কোয়ারেন্টাইন কাটানো ‘রেহানা মরিয়ম নূর’- এর বাকি সদস্যদের স্থিরচিত্র ও ভিডিওতে দেখা গেলেও কোথাও ছিলেন না সাদ। সব সময় ছিলেন ক্যামেরার পেছনে, আড়ালে! কিন্তু এবার তাকে পাওয়া গেল ক্যামেরার সামনে!

 

‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে যোগ দিতেই সহকর্মীদের সাথে কান উৎসবে উপস্থিত হন সাদ। প্রদর্শনী শুরুর আগে কানের ডেবুসি থিয়েটারের সামনে দলীয় ছবিতে অংশ নেন তিনি।

 

স্থিরচিত্রে সবার মধ্যমণি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র আজমেরী হক বাঁধন। তাকে ঘিরে নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদসহ ছবি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সাতজন। স্থিরচিত্রটি দেখলে যে কারো মনে হতে পারে, সাত ভাই চম্পার কথা! বাঁধন ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে কানের আমন্ত্রণে গিয়েছেন নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, নির্বাহী প্রযোজক বাবু, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শৈব, কালারিস্ট চিন্ময়, প্রোডাকশন ডিজাইনার উজ্জ্বল, সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন। এদিন তাদের সাথে সিঙ্গাপুর থেকে এসে অংশ নেন এই ছবির প্রযোজক জেরেমি চুয়া। ছবিটির প্রদর্শনী শুরুর আগে বাঁধন শুধু বললেন, ‘সবার একটু শুভ কামনা চাই।’

 

কান উৎসবের ‘আনসার্টেন রিগার্ড’ (ভিন্ন দৃষ্টিকোণ) বিভাগে বাংলাদেশের এই ছবিটিসহ এ বছর মনোনয়ন পেয়েছে মোট ১৫ দেশের ১৮টি সিনেমা। এ বিভাগে বিচারকদের সভাপতি হিসেবে এবার থাকছেন ব্রিটিশ নির্মাতা অ্যান্দ্রেয়া আর্নল্ড। বিচারক দলে আরও থাকছেন মার্কিন নির্মাতা মাইকেল কোভিনো, ফরাসি অভিনেতা এলসা জিলবারস্টেইন। আর্জেন্টিনার নির্মাতা ড্যানিয়েল বারম্যান এবং আলজেরিয়ান নির্মাতা মউনিয়া মেডৌর।

 

পরিচালক সাদের দ্বিতীয় ছবি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ । এর আগে ‘লাইফ ফ্রম ঢাকা’ নির্মাণ করেন তিনি।

 

আঁ সার্তে রিগার বিভাগে নির্বাচিত হওয়ায় ছবির পুরো টিমকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন দেশের শিল্পী-নির্মাতারা।

 

কানের সর্বোচ্চ সম্মাননা পাম দো’র পরে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার আ সার্তে বিভাগ। আর তাই দিনশেষে যদি সেরার স্বীকৃতি না-ও মেলে তাতে মোটেই দুঃখ থাকবে না – বললেন ছবির মরিয়ম।

 

২০০২ সালে কান উৎসবে ডিরেক্টর’র ফোর্টনাইটে স্থান পেয়ে ফিপরেস্কি পুরস্কার পেয়েছিল নির্মাতা তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। এবার যদি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ জেতে পুরস্কারটি তবে ইতিহাসের অংশ হবে লাল-সবুজের প্রিয় বাংলাদেশ।

 

এক নজরে পুরো টিম :

 

প্রযোজনা কোম্পানি : পটোকল, মেট্রো ভিডিও

অভিনয়শিল্পী : আজমেরী হক বাঁধন, আফিয়া জাহিন জাইমা, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, কাজী সামি হাসান, সাবেরি আলম

পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক: আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ

প্রযোজক : জেরেমি চুয়া

সহ-প্রযোজক : রাজিব মহাজন, সাইদুল হক খন্দকার

নির্বাহী প্রযোজক : এহসানুল হক বাবু

চিত্রগ্রাহক : তুহিন তমিজুল

ব্যবস্থাপক : আলি আফজাল উজ্জ্বল

অভিনয়শিল্পী নির্বাচক : ইয়াছির আল হক

বিশ্ব পরিবেশনা : ফিল্মস বুটিক

দৈর্ঘ্য : ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট