রুটির দামবৃদ্ধি: রক্তক্ষয়ী এক দাঙ্গার ইতিহাস

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

এমন খাদ্য সংকট সমাজে কোন ধরণের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তার নজির দেখা দেখা গিয়েছিল মিশরে ১৯৭৭ সালে।

 

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত রুটির ওপর ভর্তুকি ওঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মিশর জুড়ে দুদিন ধরে ব্যাপক দাঙ্গা হাঙ্গাম শুরু হয়, যার জেরে প্রায় ৮০ জন মারা যায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট সাদাত ভর্তুকি তোলার ঐ সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হন।

 

এরপর থেকে মিশরে কোনো সরকারই রুটির ওপর ভর্তুকি তোলার সাহস দেখায়নি। বিবিসি।

 

জেইন আবেদিন ফুয়াদ নামে একজন কবি এবং সমাজকর্মীকে তখন দোষারোপ করা হয়েছিল যে লেখালেখি, বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে তিনি দাঙ্গায় উসকানি দিয়েছিলেন।

 

মিশরীয় ঐ কবি ১৯৭৭ সালের রুটি নিয়ে সেই তুমুল দাঙ্গার ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন যেভাবে :

 

প্রেসিডেন্ট সাদাত মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে মিশরে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথ নেন, কিন্তু তার এই নীতির পরিণতিতে মিশরে ধনী এবং দরিদ্রদের মধ্যে বৈষম্য আরো বাড়তে শুরু করে। সেই সাথে বাড়তে থাকে অসন্তোষ।

 

সাদাতের অর্থনৈতিক সংস্কার একসময় স্থবির হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ১৯৭৬ সালে তিনি আইএমএফ-এর কাছ থেকে ৩০ কোটি ডলার জরুরী সাহায্য চাইলেন। আইএমএফ ঋণ দিতে রাজী হলো কিন্তু শর্ত দিল যে খাদ্যে ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে এবং মুক্ত বাজার চলতে দিতে হবে।

 

সুতরাং ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে সরকার ভর্তুকি বন্ধ করে দিল, এবং রাতারাতি রুটির দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেল।

 

আর তাতেই জনমনে চাপা অসন্তোষ রাস্তায় বিস্ফোরিত হলো। মিশর জুড়ে রক্তাক্ত দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়লো। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের সাথে বিক্ষুব্ধ মানুষজন রীতিমত মুখামুখি লড়াইতে নামে। রাতভর দাঙ্গার পর সরকার প্রতিবাদ সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। সতর্ক করা হলো কোনোরকম বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেনাবাহিনী নামানো হয়।

 

কিন্তু তাতে মানুষ ভয় পেলনা। বিক্ষুব্ধ লোকজন জনপরিবহন বন্ধ করে দেয়। অফিস-দোকান-কল কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। নানা জায়গায় শুরু হয় ভাঙচুর।

 

বিক্ষোভ সামলাতে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভে গুলি চালায়। মারা যায় প্রায় ৮০ জন।

 

মিশর জুড়ে লক্ষ লক্ষ লোক ঐ বিক্ষোভে অংশ নেয়। কিন্তু তদন্তের সময় সরকারি কৌসুলিরা একজন ব্যক্তির দিকে আঙ্গুল তুললেন – কায়রোর তরুণ কবি-গীতিকার জেইন আল আবেদিন ফুয়াদ। সরকারের তদন্তকারীরা অভিযোগ করলেন এই লোকই নষ্টের গোঁড়া। তার লেখা মানুষজনকে উসকে দিয়েছে।

 

“তারা আমাকে গ্রেপ্তার করলো এবং বললো আমি নাকি ৬০ লক্ষ মানুষকে উসকে দিয়ে বিক্ষোভ করতে রাস্তায় নামিয়েছি,” বিবিসিকে বলেন জেইন। তাকে আটক করে আদালতে হাজির করা হয়।

 

“আমি সরকারি কৌসুলির সামনে দাঁড়ালাম। তার সাথে করমর্দন করলাম। তাকে বললাম আপনাকে ধন্যবাদ। কারণ আপনি বলছেন যে একজন কবির কথাতেই ৬০ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লো, তাহলে এই কবি তো ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। যদিও বাস্তবে তা হয়নি, তারপরও এমন কথা বলা তো একজন কবির জন্য বিরাট প্রশংসা এবং স্বীকৃতি, এবং আমি এই প্রশংসা গ্রহণ করলাম।”

 

জেইন ১৯৭০ দশক থেকেই জেইন কবিতা লেখেন এবং তার লেখায় ছিল মিশরের সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র পিছিয়ে পড়া মানুষদের অধিকারের কথা। ফলে প্রেসিডেন্ট সাদাতের শত্রুতে পরিণত হন তিনি।

 

এক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠের পর প্রেসিডেন্ট সাদাতের নীতির কড়া সমালোচনা করার পর তিনি সরকারের তোপের মুখে পড়ে যান। জেইন জানতেন না যে ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী।

 

“আমাকে কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। অমি জানতাম না মাদাম জেহান সাদাত সামনের সারিতে বসে রয়েছেন। আমার কবিতার একটি পংক্তি ছিল – ও মিশরের মানুষ, তোমরা ক্ষুধা- নির্যাতনের যুদ্ধে সামিল হও। ঐ বাক্যটি আমি যখন পড়ছিলাম, মাদাম জেহান উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন মিশরে কোনো ক্ষুধা নেই,” বলেন জেইন।

 

পরপরই আয়োজকরা তাকে জানান প্রেসিডেন্ট অফিস থেকে নির্দেশ এসেছে তাকে যেন মিশরে কোনো অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠের জন্য ডাকা না নয়।

 

“তার অর্থ, সেদিনই আমি নিষিদ্ধ হয়ে গেলাম,” বলেন জেইন। কিন্তু জেইন কবিতা লেখা ছাড়লেন না।

 

দাঙ্গার শুরু কীভাবে?

কীভাবে দাঙ্গা শুরু হলো তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জেইন বলেন, সবাই যেখানে আশা করছিল মজুরী-বেতন বাড়বে সেখানে খাবারের ওপর ভর্তুকি তুলে নেয়ায় মানুষজন ক্ষেপে যায়।

 

সেই ক্রোধের প্রকাশ দেখা গেলে পরদিন ১৮ই জানুয়ারি সকালে রাস্তায়। জেইন সেদিন কায়রোতে তার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিলেন।

 

“আমি রেডিওতে রুটির দাম বেড়ে যাওয়ার খবর শুনলাম। ভাবার চেষ্টা করছিলাম এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। তারপরই রাস্তায় স্লোগান শুনলাম। আমি গিজা স্কয়ার পর্যন্ত হাঁটলাম, এবং দেখলাম পুলিশ স্টেশন এবং বিভিন্ন সরকারি অফিসের সামনে মানুষজন জড় হয়ে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তবে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল।”

 

ক্যাম্পাস থেকে শহরের কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সময় জেইন শুনতে পেলেন একটি সমাবেশে কজন বিক্ষোভকারী সমস্বরে তার লেখা গীতি-কবিতা সুর করে আওড়াচ্ছে। “তারা তিনটি গান গাইছিল। তার একটি ছিল আমার লেখা।”

 

কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই বিক্ষোভ সমাবেশ একসময় সহিংস হয়ে উঠলো। সরকারি কিছু দোকানপাটে খাবার লুঠ হলো।

 

পরিস্থিতি সামলাতে কঠোর ব্যবস্থা নিল সরকার। কায়রো শহরের কেন্দ্রে সর্বত্র সেনাবাহিনীর টহল শুরু হয়।

 

এক পর্যায়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে গুলির নির্দেশ দেয়া হলো। ফলে, বাড়তে থাকে আহত-নিহতের সংখ্যা যা একসময় কয়েকশতে দাঁড়ায়, যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্যও ছিল।

 

জেইন বলেন, পুলিশ গুলি চালানোর আগ পর্যন্ত তেমন কোনো সহিংসতা হয়নি।

 

যখন গুলি হলো, মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়লো। পিরামিড যাওয়ার রাস্তায় নাইট ক্লাবগুলোকে বিক্ষুব্ধ মানুষজন টার্গেট করে। অনেকগুলোতে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়, কারণ সাধারণ মানুষজন সেগুলোকে ধনীদের অপচয়ের প্রতীক হিসাবে দেখতো। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও স্লোগান তোলা হচ্ছিল। বিক্ষুব্ধ লোকজন সরকারি-বেসরকারি অফিসে ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ শুরু করে।

 

দুদিন ধরে চলা দাঙ্গা-বিক্ষোভে ৭৯ জন মারা যায়। আহত হয় শত শত মানুষ। পুলিশ হাজারেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করে। তাদের একজন ছিলেন জেইন।

 

তিনি বলেন, “আদালতে দেখলাম অনেকের একটি চোখ নেই। কারো একটি হাত নেই। একটি পা নেই।”


এখনও মিশরে মানুষজন রেশন কার্ডের মাধ্যমে প্রতিদিন বাজার মূল্যের দশ ভাগের এক ভাগ ভাগ দামে পাঁচটি করে রুটি কিনতে পারেন।

 

তবে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা স্বত্বেও জিতেছিল বিক্ষোভকারীরাই। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকার নতি স্বীকার করলো, এবং প্রেসিডেন্ট সাদাত রুটির ওপর ভর্তুকি পুনর্বহাল করলেন।

 

কিন্তু দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রাণহানির কোনো দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট নিতে চাইলেন না। দায় চাপালেন তথাকথিত বামপন্থী ষড়যন্ত্রকারীদের ওপর। তাদের এক নম্বরে ছিলেন জেইন আবেদিন ফুয়াদ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলো যে তিনি মানুষকে সহিংসতায় উসকে দিয়েছেন।

 

জেইনকে খুবই দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে আটক করা হয়। আদালত বার বার তাকে মুক্তির নির্দেশ দিলেও সরকার তাকে প্রায় দেড় বছর আটকে রাখে।

 

তিনি বলেন, “সাদাত তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিবাদকারীদের গালি-গালাজ করে গেছেন । ‘ওদেরকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেব , কমলার মতো চিপে ছোবড়া বানিয়ে দেব’- এমন সব বাক্যও তিনি ব্যবহার করেছেন।”

 

প্রেসিডেন্ট তার আক্রোশের ঝাল ঝেড়েছিলেন দাঙ্গার সূত্রে আটক কয়েদিদের ওপর।

 

জেইন বলেন, কারাগারের ভেতর দুই মিটার দৈর্ঘ্য এবং দেড় মিটার প্রস্থের ছোটে একটি সেলে তাদের ছয়জনকে রাখা হয়েছিল। দিনের মধ্যে সাড়ে তেইশ ঘণ্টাই তাদেরকে ঐ সেলে থাকতে হতো।

 

১৯৭৮ সালে জেইনকে মুক্তি দেয়া হয়।

 

ঐ গণ অসন্তোষ এবং দাঙ্গা এতই ভীতি সঞ্চার করেছিল যে তারপর মিশরে কোনো সরকারই রুটির ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা ঘুণাক্ষরেও তোলেনি। এখনও মিশরে মানুষ রেশন কার্ডের মাধ্যমে প্রতিদিন বাজার মূল্যের দশ ভাগের এক ভাগ ভাগ দামে পাঁচটি করে রুটি কিনতে পারেন।

 

ঐ ক্ষোভ-দাঙ্গা সম্পর্কে এতদিন পর এখন আপনার কী মনে হয়? তার কী প্রয়োজন ছিল? বিবিসির এই প্রশ্নে জেইনের উত্তর ছিল,”আমার নিজের এবং আরো অনেকের ব্যক্তিগত অনেক ক্ষতি-কষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের বলা যায় যে দেখ তোমাদের সব কথাই কিন্তু আমরা মেনে নেবনা।”

 

জেইন আবেদিন ফুয়াদ এখন ক্যানাডায় থাকেন। এখনও কবিতা লিখে চলেছেন তিনি।