ডায়মণ্ডের ‘অন্তর্ধানে’ পদ্মার করুণ চিত্রায়ণ

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গুণী নির্মাতা সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘অন্তর্ধান’ — মূলত এখানে প্রায় অন্তর্ধান ঘটেছে একটি নদীর। একসময় ‘প্রমত্তা’, ‘সর্বনাশা’ ইত্যাদি ছিল যে নদীর বিশেষণ। যেসব মানুষের জীবন-জীবিকা ওই নদীকেন্দ্রিক ছিল। নদীর অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন থেকেও হারিয়ে গেছে আনন্দ-স্বস্তি-সুখ। নদীনির্ভর পেশা হারিয়ে তারা হয়ে পড়েছে উন্মূল। দারিদ্র্যের কষাঘাতে হয়েছে জর্জরিত। ‘অন্তর্ধান’ চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে একটি পরিবারের গল্প বলতে গিয়ে পরিচালক গ্রামীণ সমাজের খণ্ডের এরকম চিত্রই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

ময়েজ ছিলেন জাল ও নৌকা ব্যবসায়ী। স্ত্রী রুমালি, কন্যা নদী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তার ছোট সংসার। কিন্তু নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এবং মরুকরণের কারণে তার ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সে কী করবেন বুঝতে পারেন না। এদিকে বাড়িতে চুলায় হাঁড়ি চড়ে না। গরু বিক্রি, কৃষিকাজের উদ্যোগ — কিছুতেই দারিদ্র্যদশা দূর হয় না। অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে যান।

 

ময়েজও একই সিদ্ধান্ত নেন। মাতবরের পরামর্শক্রমে ভিটেমাটি বিক্রি করার ও শিশুকন্যাকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কারণ উদ্বাস্তু পরিস্থিতিতে মেয়েকে সঙ্গে নেয়া ঠিক হবে না।

 

‘অন্তর্ধান’ নিরতিশয় দুঃখভারাক্রান্ত এক কাহিনীচিত্র। অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড একজন সমাজসচেতন চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজেকে হাজির করেছেন। তার ‘নাচোলের রাণী’ চলচ্চিত্রটি বিপ্লবী ইলা মিত্রকে নিয়ে নির্মিত। দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘গঙ্গাযাত্রা’য় নিম্নবর্গের মানুষ ডোম ও পতিতাদের প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখা গেছে। নিম্নবর্গের মানুষদের জীবনযাত্রা চিত্রায়ণের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রগুলো দারিদ্র্যনির্ভর আর্ট ঘরানায় অন্তর্ভুক্ত হতে চায়।

 

কিন্তু তার ‘অন্তর্ধান’ চলচ্চিত্রে কেবল দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্টের সারাৎসারই দেখা গেল। অথচ আমরা জানি, দরিদ্র মানুষের জীবনেও আনন্দ থাকে। থাকে দারিদ্র্যকে মোকাবেলা করার নানা উদ্যম, থাকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ। 

 

পদ্মা নদীকেন্দ্রিক ‘অন্তর্ধান’ চলচ্চিত্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্যা নিয়ে নানা কথা বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত  মানুষগুলোর জীবনযাপনের চিত্রায়ণ করা হয়েছে পুরো সিনেমাজুড়ে। পদ্মাপাড়ের মানুষের এই চিত্রায়ণ পুরো উপমহাদেশের জন্য বিশেষ বার্তা বহন করে।